
সদস্য তালিকায় নাম নেই, ফাইল প্রস্তুত নয়; তবুও ঋণ বিতরণের অভিযোগ!
সাতক্ষীরার তালা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (বিআরডিবি) নারায়ণ চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ঋণ বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সদস্য তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের ঋণ প্রদান, সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের সম্মতি ছাড়াই ঋণ বিতরণ এবং প্রয়োজনীয় ফাইল ও ঋণ বই প্রস্তুত না করেই ঋণ ছাড় করা হয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে তালা উপজেলার এনায়েতপুর-১ সমিতির ঋণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এনায়েতপুর-১ আবর্তক খাতের আওতায় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বিআরডিবির প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করা হয়নি। সমিতির সদস্য তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদেরও ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণের বিষয়ে সমিতির কমিটির অনেক সদস্যই অবগত ছিলেন না বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিআরডিবির পরিদর্শক (মূল) সম্রাট চক্রবর্ত্তী বলেন, এনায়েতপুর-১ সমিতিতে বিভিন্ন জটিলতা ও বিরোধের কারণে পূর্বে ঋণ প্রস্তাবটি এআরডিও কর্তৃক বাতিল করা হয়েছিল এবং ঋণ বিতরণ কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।
তিনি দাবি করেন, “ঋণ প্রস্তাব বাতিল হওয়ার প্রায় এক মাস পর আমি জানতে পারি, সমিতির সভাপতি ও সম্পাদককে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নারায়ণ চন্দ্র সরকার এবং পরিদর্শক নাজমুলের সমন্বয়ে নতুন করে ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করা হয়নি।”
সম্রাট চক্রবর্ত্তী আরো অভিযোগ করে বলেন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিদর্শকের নামে যেসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়, সেখানে মাঠ পর্যায়ের কাজের সুবিধার্থে অনেক সময় পূর্ব থেকেই কিছু ব্ল্যাংক কপিতে স্বাক্ষর নেওয়া থাকে। তার দাবি, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তার অজান্তে নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “এলএপি-৩ (LAP-3) ফরমেও সাধারণত পরিদর্শকের স্বাক্ষর পূর্বেই নেওয়া হয়। বাতিল হওয়া ঋণ প্রস্তাবে আমার কোনো স্বাক্ষর ছিল না, অথচ সভাপতি ও ম্যানেজারের স্বাক্ষর ছিল। পরে যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়, সেখানে পূর্বে নেওয়া স্বাক্ষরের ফটোকপি ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমার সন্দেহ। আমার জ্ঞাতসারে বা উপস্থিতিতে কোনো মূল নথিতে স্বাক্ষর করা হয়নি।”
সম্রাট চক্রবর্তী আরও দাবি করেন, বর্তমানে নারায়ণ চন্দ্র সরকার বিভিন্ন মহলে এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে, এনায়েতপুর-১ সমিতির ঋণ বিতরণে তার সম্মতি ছিল। তবে তিনি এ দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “যদি আমার সম্মতি থাকত, তাহলে ঋণ বিতরণের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রয়োজনীয় পাস বই, সভার রেজুলেশন, সদস্যদের শেয়ার ও সঞ্চয় জমা এবং সরকারের নির্ধারিত নয়টি শর্ত যথাযথভাবে পূরণ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব শর্তের কোনোটিই পূরণ করা হয়নি বলে আমি জানতে পেরেছি। এমনকি সদস্য ভর্তি করার সময় নির্ধারিত ভর্তি ফিও গ্রহণ করা হয়নি।”
তার দাবি, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের প্রমাণ থাকত। কিন্তু তার অজান্তে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি ঋণ বিতরণের সময় প্রয়োজনীয় ফাইল ও ঋণ বইও প্রস্তুত ছিল না। ফলে পুরো ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের একাধিক কর্মচারী দাবি করেন, তালা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসে বিআরডিবির বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। তারা আরও অভিযোগ করেন, অফিসের ভেতরে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে তাদের দাবি।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নারায়ণ চন্দ্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তবে সদস্য তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের ঋণ প্রদান, পরিদর্শকের সম্মতি ছাড়াই ঋণ বিতরণ, ফাইল ও ঋণ বই প্রস্তুত না করেই ঋণ বিতরণ এবং সম্রাট চক্রবর্তীর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা বিআরডিবির উপপরিচালক আরিফুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
চলবে... পর্ব-২ এ থাকছে: ঋণ বিতরণের নথিপত্রে অসঙ্গতি, সদস্য তালিকার বাইরে কারা ঋণ পেয়েছেন এবং নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের আরও বিস্তারিত তথ্য।